
গোড়াতেই একটা কথা বলে রাখি। এই লেখাটা মতামত নিয়ে নয়। কে কোন মতে বিশ্বাস করবেন, কোন দলের হয়ে গলা ফাটাবেন, সেটা একান্তই তাঁর ব্যাপার। মত রাখার স্বাধীনতা, মত জানানোর স্বাধীনতা, দুটোই মানুষের অধিকার। এই লেখাটা মিথ্যে খবর নিয়ে। যে খবর ঘটনা হিসেবেই মিথ্যে। আর যেটা ছড়ালে মানুষের ক্ষতি হয়।
যাইহোক, আসল কথায় আসি।
রাত সাড়ে দশটার মেসেজ
ধরুন রাত সাড়ে দশটা। সারাদিনের খাটাখাটনির পর সবে খাওয়া-দাওয়া মিটেছে। ফোনটা টুং করে উঠল। ফ্যামিলি গ্রুপ। মেসেজের মাথায় ছোট্ট করে লেখা, Forwarded many times ।
"সাবধান! এলাকায় ছেলেধরা ঘুরছে। বাচ্চাদের একা ছাড়বেন না।"
সঙ্গে একটা ঝাপসা ভিডিও। কোথাকার ভিডিও, কবেকার ভিডিও, কেউ জানে না। তার নিচে মেজোমাসির সংযোজন,
"সত্যি কিনা জানি না। তবু সাবধানের মার নেই।"
ব্যস। পাঁচ মিনিটের মধ্যে মেসেজটা দশটা গ্রুপ ঘুরে ফেলল। কেউ পড়ল। কেউ পড়ল না। কিন্তু ফরওয়ার্ড সবাই করল। পরদিন সকালে পাড়ার মোড়ে এক অচেনা লোককে ঘিরে ধরল ভিড়।
এই দৃশ্যটা আমার বানানো। কিন্তু আপনাদের কারোর কাছেই নিশ্চয়ই অচেনা নয়।
"আমি তো শুধু ফরওয়ার্ড করেছি"
এই লাইনটা আমরা সবাই খুব ভালো করে জানি। কেউ ধরলেই মুখস্থ ডায়লগ বেরিয়ে আসে, "আমি তো লিখিনি ভাই। আমার কাছে এসেছিল। আমি শুধু পাঠিয়েছি।"
মহামান্য আদালত কিন্তু এই ডায়লগে আর ভুলছেন না।
২০২৩ সালে মহামান্য মাদ্রাজ হাইকোর্টে উঠেছিল অভিনেতা ও রাজনীতিক এস. ভে. শেখরের মামলা। উনি ফেসবুকে অন্যের লেখা একটা আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। ওনার যুক্তি, পোস্টটা ভালো করে পড়েননি। পরে মুছেও দিয়েছেন। ক্ষমাও চেয়েছেন। মহামান্য হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিলেন, যিনি মেসেজ ফরওয়ার্ড করছেন, ধরে নিতে হবে তিনি তার বিষয়বস্তু জেনেই করছেন। ছড়ানোর দায়ও তাঁর। মহামান্য আদালত আরও একটা মোক্ষম কথা বলেছিলেন। লাইক পাওয়ার আনন্দটুকু যিনি চেটেপুটে নেবেন, পরিণতির জন্যেও তাঁকে তৈরি থাকতে হবে।
মামলা খারিজের আর্জি নিয়ে উনি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে গেলেন। ২০২৩ সালের অগস্টে মহামান্য শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি। উল্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলে সাবধানে করতে হবে।
মোদ্দা কথা, ফরওয়ার্ড করা মানে মেসেজটার নিচে নিজের নামে সই করে দেওয়া।
আইন কি বলছে?
নতুন ফৌজদারি আইন, মানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫৩ ধারাটা খুলে দেখুন। কেউ যদি মিথ্যে খবর, গুজব বা ভুয়ো তথ্য বানান, প্রকাশ করেন কিংবা ছড়ান, আর তার ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়, বা এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে খেপে ওঠে, তাহলে সেটা অপরাধ। আইনে পরিষ্কার লেখা আছে, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ছড়ালেও একই কথা। অর্থাৎ হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, কেউ ছাড় পাবে না। শাস্তি তিন বছর পর্যন্ত জেল, জরিমানা, কিংবা দুটোই।
তবে আইন একপেশে নয়। একই ধারায় একটা ব্যতিক্রমও আছে। কেউ যদি যুক্তিসঙ্গত কারণে সত্যিই বিশ্বাস করে থাকেন যে খবরটা সত্যি, আর সরল বিশ্বাসে, কোনো খারাপ মতলব ছাড়া পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে সেটা অপরাধ নয়।
কিন্তু একটু খেয়াল করুন। "যুক্তিসঙ্গত কারণ" আর "সত্যি কিনা জানি না", এই দুটো এক জিনিস নয়। যিনি নিজের হাতেই লিখে দিচ্ছেন তিনি জানেন না, তিনি যাচাই না করেই পাঠাচ্ছেন।
আইনের একেবারে গোড়ার একটা শিক্ষা আছে। শোনা কথার উপর রায় দেওয়া যায় না। মহামান্য আদালতে "শুনেছি" বলে কোনো সাক্ষ্যের দাম প্রায় নেই বললেই চলে। আমরা কিন্তু রোজ রাতে, ফোন হাতে, ঠিক সেটাই করি। শোনা কথার উপর রায় দিয়ে, সেই রায় দশজনের কাছে পাঠিয়ে দিই।
গুজব যখন প্রাণ নেয়
ভয়টা কাল্পনিক নয়। কয়েক বছর আগে দেশের নানা প্রান্তে "ছেলেধরা" গুজবে ভর করে একের পর এক গণপিটুনি হয়েছিল। নিরীহ মানুষ মারা গিয়েছিলেন। শুধু একটা ভুয়ো মেসেজের জন্য। গুজবটা প্রথম কে বানিয়েছিল, তাকে হয়তো খুঁজেই পাওয়া যায়নি। কিন্তু মেসেজটা যে হাজার হাত ঘুরে পৌঁছেছিল, সেই প্রতিটা হাতই ছিল আগুনের এক-একটা কাঠি।
২০১৮ সালে তেহসিন পুনাওয়ালা মামলায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট গণপিটুনি রুখতে বিস্তারিত নির্দেশ দেন। তার মধ্যে ছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন, উসকানিমূলক মেসেজ ছড়ানো আটকাতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যাঁরা এমন মেসেজ ছড়াবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশকে এফআইআর করতে হবে। মহামান্য আদালত বুঝেছিলেন, ভিড়টা রাস্তায় জমে অনেক পরে। আগুনটা জ্বলে ওঠে মোবাইলের পর্দায়।
তাহলে কি মুখ বন্ধ করে বসে থাকব?
একেবারেই না। ২০১৫ সালে শ্রেয়া সিঙ্ঘল মামলায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬এ ধারাটাই বাতিল করে দিয়েছিলেন। কারণ ধারাটা এতটাই গোলমেলে ছিল যে, যে কোনো কথাকেই অপরাধ বানিয়ে দেওয়া যেত। মহামান্য আদালত তিনটে জিনিস আলাদা করে দেখিয়েছিলেন। আলোচনা। কোনো মতের পক্ষে সওয়াল। আর উসকানি। প্রথম দুটো পুরোপুরি আপনার অধিকার। আইন হাত দেবে শুধু তখন, যখন কথাটা সরাসরি হিংসা বা অশান্তির দিকে ঠেলে দেয়।
তর্ক করুন। দ্বিমত করুন। গলা ফাটান। শুধু মিথ্যেটা ছড়াবেন না।
ফরওয়ার্ডের আগে আমার নিজের রুল বুক
আমার একটা ছোট্ট রুল বুক আছে। আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই।
ধারা ১: মেসেজটা কে বানিয়েছে, আসল উৎস কি? "শুনেছি", "এক ডাক্তারবাবু বলেছেন", এরকম হাওয়ায় ভাসা সূত্র মানেই গোলমাল।
ধারা ২: খবরটা কোনো নির্ভরযোগ্য খবরের কাগজে বা চ্যানেলে আছে কি? দু'মিনিট খুঁজলেই অনেক সময় জানা যায়, ছবিটা পাঁচ বছরের পুরনো, বা বহু আগেই ভুয়ো প্রমাণিত।
ধারা ৩: মেসেজটা কি আমাকে রাগিয়ে দিতে, বা ভয় পাইয়ে দিতে চাইছে? তাহলে সাবধান। গুজবের প্রধান অস্ত্রই হল আবেগ।
ধারা ৪: নিশ্চিত না হলে? পাঠাব না। চুপ করে থাকাটাও কিন্তু একটা দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
শেষ কথা
একটা ক্লিকে আগুন লাগতে পারে। দেশলাইটা হয়তো অন্য কেউ বানিয়েছে। কিন্তু কাঠিটা ঘষছে আমাদেরই আঙুল। আঙুলটা আমাদের। তাই দায়ও আমাদের।
পরের বার মেসেজের মাথায় "Forwarded as received" দেখলে একবার থামবেন। মনে রাখবেন, আপনার হাত ঘুরে গেলে সেটা আর শুধু "received" থাকে না। সেটা হয়ে যায় আপনার পাঠানো খবর।
সূত্র
যাচাই করে নিন। ভুয়ো খবর নিয়ে লেখা নিজেই যেন ভুয়ো না হয়।
- মহামান্য মাদ্রাজ হাইকোর্ট, এস. ভে. শেখর মামলা (২০২৩): LiveLaw
- মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি (অগস্ট ২০২৩): MediaNama
- ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩, ধারা ৩৫৩ (সরকারি পাঠ): India Code
- তেহসিন এস. পুনাওয়ালা বনাম ভারত সরকার (২০১৮): iPleaders, Supreme Court Observer
- শ্রেয়া সিঙ্ঘল বনাম ভারত সরকার (২৪ মার্চ ২০১৫): Wikipedia, SFLC.in
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
Copyright © Jewel Chanda